Download ভারতের একটি কারাগারে দুই বছরের বেশি সময় ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে বার্মার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ২ শ মানুষ। তাদের ভাষ্যমতে, ২০০৮ সালের শেষ ও ২০০৯ এর প্রথমদিকে থাইল্যান্ডের সেনারা তাদের নৌকা থেকে ইঞ্জিন খুলে নিয়ে তাদের বেঁধে ফেলে রেখে যায়। পরে ভারতীয়রা তাদের সাগর থেকে উদ্ধার করে।
তাদেরই একজন, আলী ভারতের পোর্ট ব্লেয়ার কারাগারে বন্দী। তার সাথে ফোনে কথা বলতে পেরেছেন শেখ আজিজুর রহমান।
“আমি মায়ানমারের আরাকানের একজন রোহিঙ্গা এবং ১৯৯৯ সালে আমি বাংলাদেশে চলে আসি। মায়ানমারে সেখানকার পুলিশ নিয়মিত আমাদের উপর অত্যাচার করতো। তারা আমাদের কায়িক শ্রমে বাধ্য করতো। আর বেশিরভাগ সময়েই তার জন্যে আমাদের কোন টাকা দেওয়া হতো না। আমাদের জীবন ছিল দুর্বিষহ। কাজেই, আমার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে আমরা চুপচাপ মায়ানমার ছেড়ে চলে এলাম।"
রোহিঙ্গারা বার্মার ঐতিহাসিক মুসলিম সংখ্যালঘু। সে যাই হোক, ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। রোহিঙ্গারা বলে, বার্মার নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আইনগতভাবেই ভয়াবহ নির্যাতন করে।
আলী বলেন বাংলাদেশে না এসে তাঁর আর কোন উপায় ছিল না। কিন্তু সেখানেও তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
জাতিসংঘের ধারণা, সাধারণ মানুষদের সাথে বাস করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা। আর ৩টি শরণার্থী শিবিরে বাস করে আরো তিরিশ হাজার ।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের কোন অভিবাসন অধিকার বা আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া হয়নি।
কাজেই আলীর মতো, দিন দিন আরও অনেক রোহিঙ্গা কাজ ও ভালো আশ্রয়ের আশায় বিপদজন��ভাবে অবৈধ উপায়ে নৌকায় করে দক্ষিণ থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে।
"মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে থাইল্যান্ডে সেখানকার সেনারা আমাদের গ্রেফতার করে। আমাদের ইঞ্জিনবিহীন নৌকায় মাঝ সমুদ্র�� ছেড়ে দেওয়ার আগে ১০-১২ দিন তারা আমাদের বন্দী করে রাখে। কোন খাদ্য ও পানীয় ছাড়া আমরা ১৪ দিন ভেসে ছিলাম। আমাদের বেশিরভাগই মারা যায়। থাই নৌবাহিনী আমাদের ৪১২ জনকে একটি নৌকায় তুলে সমুদ্রে ছেড়ে দেয়। সমুদ্রে আমাদের ৩০৫ জন মারা যায়। আমরা মাত্র ১০৭ জন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছাতে পেরেছি।”
তারপর তাদের ভারতীয় কারাগারে ঢোকানো হয়।
নৌকার সবাই বলেছেন তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।
তবে তাদের মাত্র অর্ধেককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। উদ্ধারের দুই বছর পরেও ২০০ এর বেশি লোক এখনো কারাগারে।
আলী বাংলাদেশে ফেরার জন্যে ব্যাকুল।
“বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী সেখানে আমার আত্মীয়েরা প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিয়েছে যাতে প্রমাণ হয় আমি বাংলাদেশের একজন বৈধ নাগরিক। তারপরও আমি জানিনা কেন বাংলাদেশ সরকার আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করলো। আমার বউ-বাচ্চারা আমাকে ফিরে পাওয়ার জন্যে কান্নাকাটি করছে। প্রতিদিন আমি কাঁদি আর বাংলাদেশে আমার বাড়িতে ফেরত যেতে চাই। কেউ আমার কথা শুনছে না। আমার ধারণা এই কারাগারে মৃত্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে কেঁদে যেতে হবে।”
১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশ UNHCR কে আর কোন রোহিঙ্গাকে নিবন্ধনে নিষেধ করেছে।
কাজেই গত ১৯ বছরে বাংলাদেশে যতো রোহিঙ্গা এসেছেন তারা অবৈধ অভিবাসী।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা নেতা সলিমুল্লাহ বলেন নেতারা ইচ্ছা করেই রোহিঙ্গাদের অবস্থার উন্নয়ন চান না।
“বাংলাদেশের মতো একটা গরীব দেশের জন্যে বর্তমান রোহিঙ্গারা এবং ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ একটি বড় বোঝা। বাংলাদেশ যদি এদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে আরও অনেক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে আসবে কারণ রোহিঙ্গারা সেখানে খুব দুঃসহ জীবন যাপন করে। ওই নতুন অনুপ্রবেশের কথা চিন্তা করেই বাংলাদেশ এই শরণার্থীদের সাহায্য করতে রাজী হয়না। তবে বাংলাদেশ যদি নিজে থেকে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মহলকে রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে উদ্যোগী করে তুলতে পারে তাহলে আমাদের সমস্যা সমাধান হতে পারে।”
তিনি বলেন সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় বার্মাকে চাপ দেওয়া।
“২০১০ সালে নির্বাচনের আগে প্রচারের সময় বার্মার বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি রোহিঙ্গাদের অবস্থা উন্নয়নে শীঘ্রই কিছু করবেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন এবং বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের অবস্থা খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়েছে। মায়ানমার যদি রোহিঙ্গাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করে তবে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশ থেকে রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে যাবে। ওটা আমাদের মাতৃভূমি।”
কিন্তু আলীর জন্যে এখন ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। তার বৌ ও পাঁচ বাচ্চা বাংলাদেশে এবং এটাই এখন তাদের বাড়ি।
“বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। আমরাও খুব কষ্টে দিন কাটানো গরীব মুসলিম। বাংলাদেশের আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত এবং বাংলাদেশে আমার পরিবারের কাছে ফেরত নেওয়া উচিত। আমরা গ্রামে বাস করি এবং মূল জনগোষ্ঠীর জন্যে বোঝা হই না। আমরা বাংলাদেশে কোন সরকারি চাকরি চাই না। আমরা দিন মজুরি করে পরিবার চালালে বাংলাদেশের জন্যে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আমরা আশা করি বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় কারাগারে আমাদের কষ্ট সমাপ্ত করতে উদ্যোগ নেবে।”
বাংলাদেশ থেকে আলীর বউও একই কথা বললেন।
“স্বামীর অনুপস্থিতিতে পাঁচ সন্তান নিয়ে আমি বিশাল বিপদে পড়েছি। গত আড়াই বছরে অনেক কষ্ট করেছি। আমি বিভিন্ন প্রতিবেশির বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করি। মাঝেমাঝে ভিক্ষা করি। বাচ্চারা অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখাতে টাকা লাগলে আরও বেশি সমস্যা হয়। সংসারের খরচ চালাতে ও অন্যান্য দেনা শোধ করতে আমি কিছুদিন আগে আমাদের বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছি। এখন আমরা খুব ছোট্ট একটা এক ঘরের বস্তিঘরে থাকি। দয়া করে আমার স্বামীকে আমাদের কাছে ফিরে আসতে সাহায্য করুন।”
আলীর এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরেও অন্যান্য রোহিঙ্গারা এখনো বিপদজনকভাবে নৌকায় মালয়েশিয়া যেতে চায়।










