
Downloadফাদার রবার্ট রেয়েস, লোকে যাকে ছুটে বেড়ানো ধর্মযাজক হিসাবেই বেশি চেনে। গত ১৬ বছর যাবত তিনি মানবাধিকার ও পরিবেশরক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে দেশজুড়ে ছুটছেন।
ক্যাথলিক চার্চ তাকে সমর্থন না দেয়ায় চার্চে কোন কাজ পাননি তিনি। মানুষের দানে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। উপাসনালয় বানিয়েছেন রাস্তা আর গাছকেই।
ম্যাডোনা ভাইরোলা কুইজন শহরের ইউনিভার্সিটি অফ ফিলিপাইনের কয়েকটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন তার সাথে।
“১৯৯৫ সালের কথা। এই ক্যাম্পাসেই একদিন সকালের প্রাত্যহিক দৌড়ানোর সময় আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম, ১৮৯৬ থেকে ১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনে যে বিপ্লব হয়েছিল তার শতবর্ষ উদযাপনে কি করা যায়। কারা যেন আমার কানে কানে চুপি চুপি বলে গেলো কেন তুমি গোটা ফিলিপাইন দৌড়ে দৌড়ে মানুষকে এই দেশ ও তার ইতিহাসকে ভালোবাসার কথা বলো। বলো, মানুষের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেমন পরিবেশ, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষ নির্বাচন, স্বাধীনতা এসবের কথা।”
তখনই তাঁর বয়স ৪০ বছর। কিন্তু তিনি সুস্থ ছিলেন এবং তিনি বিখ্যাত ম্যারাথন দৌড়বিদ সিজার গুয়ারিনের কাছে প্রশিক্ষণও নেন।
একসাথে তারা দেশব্যাপী দৌড়ানো শুরু করেন, প্রতিদিন ৬০ কিলোমিটার করে।
তারা দক্ষিণে মিন্দানাও, উত্তরে ভিসায়াস এবং আরও উত্তরে লুজন পর্যন্ত যান।
তিন বছর পরে স্পেনের ��পনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তিতে তাঁরা ম্যারাথন দৌড় শেষ করেন।
“তারপর আমি বললাম যথেষ্ট দৌড়ানো হয়েছে। কিন্তু সেরকম হলনা কারণ রাষ্ট্রপতি ইরাপের সমস্যাগুলি সামনে আসা শুরু করলো। কাজেই কয়েক সপ্তাহ পরে আমি আবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৌড়ানো শুরু করলাম। তারপর থেকেই আমি ছুটছি। ফিলিপাইনের গণমাধ্যম আমার নাম দিয়েছে ‘ছুটে বেড়ানো ধর্মযাজক’”
ফাদার রবার্ট রেয়েস বললেন, তিনি রাস্তাকে তার বেদি, গাছগুলোকে যাজক আর পৃথিবীকে তার চার্চ বানিয়েছেন।
কিন্তু ফিলিপাইনের প্রভাবশালী ক্যাথলিক চার্চ তার কর্মকাণ্ডে খুশি নয়।
“আমার নিজের বিশপ ২০০৬ সালে আমাকে দৌড়াতে নিষেধ করেন। একটি ছোট্ট চার্চের চেয়ে এতে আমি অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি। এটা যে মানুষকে সুপথ দেখানোর একটি ভালো উপায় তা চার্চের বুঝতে ���ষ্ট হচ্ছে, এতে আমি রীতিমতো হতাশ। আমি জেলে, শ্রমিক, ছাত্র, মহিলা, পরিবেশবাদী, প্রাণীপ্রেমিক, সমকামী, বিষমকামীদের মতো সমাজের প্রান্তিক মানুষ- যাদের কথা চার্চের মতো বড় প্রতিষ্ঠান শুনতে পায় না, তাদের সাহায্য করে যাবো।”
ফাদার রবার্ট রেয়েস বলেন, তার দৌড় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পরিবেশ ধ্বংসের ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়িয়েছে।
একটি স্থানীয় বেতারকেন্দ্রে তিনি প্রাণী অধিকার ও কেন তিনি নিরামিষাশী সে বিষয়ে বলছেন।
অনুষ্ঠানটির সহ-উপস্থাপক মালজ কুওদালা বলেন তারা অনেকদিন ধরেই এ অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি হিসাবে চাচ্ছিলেন।
“একজন ক্যাথলিক ধর্মযাজক প্রাণখুলে কথা বলছেন। খুব বেশি লোক এটা পারেনা। আমাদের কর্তৃপক্ষের ভেতর এমন লোক দরকার যারা আমাদের বলবেন কোথায়, কোনটা ভুল। সবকিছু ঠিক নেই। যেমন কিছুদিন আগে আমাদের বিশাল বড় ঝড় গেলো। আপনি যদি টেলিভিশন দেখেন বা বেতার শোনেন তবে বুঝতে পারবেন আমাদের দেশে পরিবেশ রক্ষায় কত বড় সমস্যা আছে। সরকারের উচিত নাগরিকদের স্বার্থ দেখা, বহুজাতিক কোম্পানিদের নয়।”
কিন্তু খোলামনে কথা বলাটা ফাদার রবার্টের জীবনে জটিলতা বাড়িয়েছে।
“আমাকে একজন আন্দোলনকারী, জঙ্গি, কট্টরপন্থী হিসাবে দেখানো হয় যাতে মনে হয়, আমি একজন কম্যুনিস্ট। আমি কম্যুনিস্টদের মতবাদ মেনে চলিনা। কিন্তু চার্চের একজন আরামপ্রিয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যিনি শুধু স্টেক খান আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে নিদ্রা যান, তার চেয়ে আমি একজন কম্যুনিস্ট যিনি তার আদর্শের জন্যে শহীদ হয়েছেন তাকে বেশি শ্রদ্ধা করি। কেন যীশু আমাদের বলেছিলেন তাকে অনুসরণ করতে? তিনি বলেছিলেন, সবকিছু পেছনে ফেলে বন্দী, ক্রীতদাস, নির্যাতিত, অসহায়দের সুখবর শোনাতে। তিনি আপোষ করেননি। তিনি তার ক্ষমতা নিয়ে খেলা করেননি। আমি কয়েকবার জেলে গিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে সব ধরণের মামলা আছে- মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহ, বিদ্রোহ- আমি সবসময় মজা করে বলি, এখনো ফুসলানোর মামলা হয়নি।”
ফাদার রবার্ট রেয়েস বলেন চার্চের গরীববান্ধব হওয়া উচিত।
১৯৯১ সালে চার্চকে যখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন কথা ছিল চার্চ গরীবের হবে। কিন্তু আমরা কি করেছি? আমরা আমাদের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছি ধনীদের সাথে, চার্চকে সুন্দর করার জন্যে চাঁদা তুলে যখন মানুষ ক্ষুধার্ত, কষ্ট পাচ্ছে, বন্দী, নির্যাতিত এবং নিজের ভিটাজমি থেকে বিতাড়িত। মানুষ ধর্মোপদেশ শুনে শুনে ক্লান্ত। মানুষ সাহায্য চায়।”
চার্চের সমর্থনবঞ্চিত হয়ে ফাদার রবার্ট রেয়েস তার সমর্থকদের দানে জীবিকা নির্বাহ করেন।
কাজেই আর কতদিন তিনি দৌড়ে যাবেন?
“দৌড়ানোটা আমার ভেতরের আবেগের শুধুই একটা রূপক। ঈশ্বরের রাজত্বের জন্যে কিছু করার প্রচেষ্টা। আপনি দেখবেন চার্চ এখন অনেক আরামপ্রদ। তারা খুব অভিজাত আর বিলাসবহুল জীবন কাটায়। তারা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাথেড্রাল আর ব্যাসিলিকাস বানাতে চাইছে। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ মানুষ ক্ষুধার্ত। তারা এর ভিতরে ঢুকবে না কারণ তাদের নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে হবে। আমার মনে হয় চার্চ গরিব আর সাধারন মানুষের সাথে নিজেদের সংযোগ হারাচ্ছে- যাদের জন্যে যীশু জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।.”আমি যেভাবেই হোক তাদের একটু আশা দেখিয়েছি। তাদের আশ্বস্ত করেছি যাই হোক না কেন আমি তাদের পাশে আছি। আমি তাদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেই না। কিন্তু আমি তাদের পাশেই থাকবো। আমি তোমাদের সাথে এবং তোমাদের জন্যে দৌড়াবো।.আমি চুপ থাকতে পছন্দ করি। আমি ধ্যানমগ্ন থাকতে চাই। এতো বছরের সংগ্রাম ও প্রতিবাদের পর আমি এসবের উৎস বের করেছি- ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার মূলে আছে�� ঈশ্বর। আমি যদি ঈশ্বরের ঘনিষ্ঠ হতে না পারি তবে এসবের কোন মানে নেই।”
কুইজন শহর থেকে এশিয়া কলিং এর জন্যে ম্যাডোনা ভাইরোলার প্রতিবেদন।










