
জসভিন্দর সেহগল
৩৩ বছরের দ্যানি ভিথালের মাত্র একটি পা আছে কিন্তু তিনি এক কিলোমিটার রাস্তা মাত্র ৪ মিনিটে দৌড়ে পেরোতে পারেন।
তিনি গাছে চড়তে পারেন, লাফাতে পারেন এবং ২৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন কাজে যান।
তিনি এ সবই করতে পারেন তার নিজের শহর ভারতের জয়পুরে স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি নকল পায়ের সাহায্যে।
বাম পায়ের হাঁটুর নীচ থেকে কেটে ফেলাটা তাকে তার জীবনের ভালোবাসার প্রতি এগিয়ে দিয়েছে।
তার অসাধারণ গল্পটি শোনাচ্ছেন জসভিন্দর সেহগল।
১৫ বছর বয়সে দ্যানি রাজধানী দিল্লীতে শুকনো ফল বিক্রি করতেন।
“একটা ট্রেনে দৌড়ে উঠতে গিয়ে আমি হঠাৎ করে পড়ে যাই। ট্রেনে আমার বাম পা কাটা যায় এবং আমি ৪৫ দিন কোমায় ছিলাম। সেটা ছিল খুবই কষ্টের।”
তিনি চার মাস হাসপাতালে ছিলেন এবং ডাক্তাররা তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচের অংশটা বাঁচাতে পারেননি।
এক বছর পরে তিনি ক্রাচের সাহায্যে একা একা দাঁড়াতে পারলেন।
একদিন তার কাকা তাকে বলেন জয়পুরে গিয়ে একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে নকল পা সংগ্রহ করতে।
“আমার কাকা আমাকে নকল পায়ের কেন্দ্রের ঠিকানা দিলেন। সেই প্রথম আমি একা একা জয়পুর শহরে আসলাম। সেখানে আমাকে বিনামূল্যে নকল পা দেওয়া হল। নকল পাটা আমার কাছে এক অসামান্য উপহার হয়ে এলো কারণ এর সাহায্যে আমি দাঁড়াতে, হাঁটতে এমনকি দৌড়াতেও পারতাম। এটার ব্যবহার শিখতে আমার দেড় মাস সময় লেগেছিল কিন্তু এখন আমি এটার সাহায্যে যা মন চায় তাই করতে পারি। এমনকি আমি ১০০ কেজি ওজনও তুলতে পারি।”
সেই নকল পা যেখানে তৈরি হয় দ্যানি এখন সেই কারখানায় কাজ করেন... সবাই সেটাকে ‘জয়পুর পা’ কেন্দ্র বলে।
প্রতি বছর তারা অন্তত বাইশ হাজার নকল পা তৈরি করে ভারত ও সারাবিশ্বে বিনামূল্যে বিতরণ করেন।
আজ দ্যানি ৫২ বছর বয়স্ক মতি লালের জন্যে নকল পা তৈরি করছেন।
দ্যানি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এটাতে কি ব্যাথা লাগে বা আরাম হয় ঠিকমতো?” “সমস্যা মনে হলে আমরা ঠিক করে দিতে পারবো”, তিনি আরও বলেন।
মতি এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তার ডান পা হারান। তিন বছর ধরে তিনি সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতে পারেন না।
কিন্তু দ্যানির বানানো এই নকল পা তার জীবন বদলে দেবে।
“দ্যানি আমার কাছে দেবতার মতো যে আমাকে এই বরটি দিয়েছে। ডাক্তাররা ভগবানের মতো। সেও তাদের একজন। এখন আমি নিজে ���িজেই হাঁটতে পারি এবং নিজেই দুনিয়াটা দেখতে পারি। আমার জন্যে এর চাইতে ভালো কোন বর হতে পারতো না।”
“যখনই আমি কারো জন্যে নকল পা বানাই আমার খুব আনন্দ হয়। আমি জানি অঙ্গ হারানোর দুঃখ কি।”
কর্মক্ষেত্রেই দ্যানির সাথে তার স্ত্রীর পরিচয় হয়।
মিনা ঠাকুর একটি নতুন জয়পুর পায়ের প্রয়োজনে চিকিৎসালয়ে এসেছিলেন।
“আমি আমার প্রেমিকের সাথে একসাথে আত্মহত্যা করার জন্যে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিলে ডান পা হারাই। সে অন্য জাতের হওয়ায় আমার বাবামা বিয়ের অনুমতি না দেওয়ায় আমরা একসাথে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা বেঁচে যাই এবং পরে বিয়ে করলে সাত ছেলেমেয়ে হয়। তাদের দুজন মারা যায়। হঠাৎ একদিন এই বিশ্বে আমাকে একা ফেলে সে উধাও হয়ে যায়।”
পরিবার চালাতে তিনি নকল পায়ের কেন্দ্রের পাশে একটি রাস্তার পাশের খাবারের দোকান খোলেন।
দ্যানি প্রতিদিন দুপুরে খেতে আসতেন...
“দ্যানির কাছে আমি খাবার বাবদ কিছু টাকা পেতাম এবং আমি নিয়মিত তাকে সেটা দিয়ে দিতে বলতাম। আমরা দুজনেই গুজরাট থেকে এসেছি। কাজেই আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক দানা বাঁধে। সে আমার পাঁচ ছেলেমেয়েসহ আমাকে বিয়ে করতে রাজি ছিল। এখন আমাদের সাত সন্তান এবং দ্যানি তাদের সবার খেয়াল রাখে।”
অনিতা পরিবারের বড় মেয়ে।
তিনি দ্যানির থেকে মাত্র ৮ বছরের ছোট।
“আমার চেয়ে ভালো বাবামা কারো হতে পারেনা। আমার বাবা সব ছেলেমেয়েসহ আমার মাকে ফেলে চলে যান। তারপর ডেভিড এসে আমাদের পরিবারকে বাঁচায়। তিনি আমাকে পড়ালেখাতেও সাহায্য করেন। এখন আমি বিবাহিতা এবং আমার একটি বাচ্চা আছে। আমাদের দেখে বাপ মেয়ে মনে হয়না এবং মানুষ অনেক সময়েই আমাদের স্বামী স্ত্রী বলে ভুল করে... হা হা হা
তারা এখন জয়পুর পা কেন্দ্রের দেওয়া একটি বাড়িতে থাকেন এবং দ্যানি প্রতিদিন ৫০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে কাজে আসা যাওয়া করেন।
তিনি খুব স্বাচ্ছন্দ্য ও দক্ষতার সাথে সাইকেল চালান। কেউ দেখলে বুঝবেই না তার মাত্র একটি পা।










